অসমাপ্ত গল্প



হঠাৎ একদিন মার্কেট এ দেখা হয়ে গেলো তার সাথে। আমি যতটা নিজেকে আড়াল করে রেখেছি এত বছর। আজ তাকে দেখার পর সব কিছুই যেনো এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। কোনো একসময় প্রহর গুনিতাম দিনে কতবার দেখা হচ্ছে। সেটা আবার ডায়রিতেও লিখে রাখতাম প্রমাণ অনুসার করে। কিন্তু আজ প্রায় আট বছর পর তাকে দেখতে পেয়ে ভাল লাগার থেকে খারাপ লাগছে। অজান্তেই চোখ থেকে অশ্রু বের হতে চাচ্ছিলো। অনেক কষ্টে চোখের অশ্রু বন্ধ করেছিলাম। কিন্তু এতদিন পর দেখা হলো কেউ কারো সাথে কোনো কথাও বলিনি। তবে আগে কে কাকে বেশি খেয়াল করতাম। সে গুলো নিয়ে ঝগড়া করতাম। কথা বলা শুরু করলে কেনো যানি শেষই হতো না।

আমি বড্ড তাড়াহুড়ো করেই তার সামনে থেকে চলে আসি। যাতে সে বুঝে আমার চোখে সে এখন ঘৃণাকারী। কিন্তু খুব হিংসে হচ্ছিলো তাকে দেখে। কেনো জানেন? কারণ তাকে পর্দা করার জন্য অনেক রিকুয়েস্ট করতাম কিন্তু সে করতে চাইতো না। বলতো বিয়ের পর করবে। হ্যাঁ সে তার কথা ঠিকই রেখেছে বিয়ের পর ঠিকই সে পর্দা করেছে তবে সেটা অন্য কাউকে সাথে নিয়ে। কিন্তু তার চোখ দু'টি আমার এখনো খুব পরিচিত। তাই তো চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম এটা সে। এইসব কথা আর মনে করতে চাই না। অনেক কষ্টে তাকে ভুলতে পেরেছি যেটা শুধু মুখে মুখেই বলি কিন্তু আধার নামিয়ে যখন রাত গভীর হয় ঘুমানোর আগে ঠিকই তার কথা ভেবে অশ্রুঝড়ে। আমি বুঝিনা সব কিছু ভুলে গেলেও মায়া কখনো ভুলা যায়না স্মৃতি কখনো মুছা যায় না। সেটা আপনি যতই আড়াল করতে চাইবেন ততোই কষ্ট পাবেন। আর আমরা সেটাই বারবার আড়াল করি। কিন্তু তাকে ভুলতে পারিনা আর কষ্ট ও আমাদের ভুলতে পারে না। তাই তো কষ্টটাকে নিজের প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছি আপন ভেবে নিয়েছি।

আমি কখনো তার সরাসরি হতে চাইতাম না। কারণ আমি সয্য করতে পারবো না তাই ভেবে। কিন্তু সেটা ভুল ছিলো সয্য শক্তি আগে থেকে দ্বিগুণিত হয়েছে। আগে যেগুলো কাজ করতো তার ৮০% ছিলো আবেগ। কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছি আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। আমি তার নামটি এখানে তুলতে চাচ্ছি না। তবে আমি তাকে পাখি বলেই ডাকতাম। জানিনা এখন সে নামে ডাকলে  সে রাগ করবে কিনা। তবে একটাই ইচ্ছা আমার। আবারো যদি ভুলবশত দেখা হয়ে যায় তাহলে তার কাছে একটা কথাই জিজ্ঞাসা করবো যে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেনো? সেটার উত্তরটা আমি এখনো খুঁজার চেষ্টা করি কিন্তু খুঁজে পাইনি।

জানি সে প্রশ্নের উত্তর তার ও জানা নেই। জানবেই বা কি করে?  কখনো সে ভাবেনি আমাকে নিয়ে। কিন্তু প্রায়ই সময় সে বলতো আমাকে যে তার একটাই ইচ্ছে সাত সমুদ্র পারি দেয়া, আকাশের চাদ সামনে থেকে দেখা তার অনেক স্বপ্ন। হয়তো আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার এটাই মূল কারণ ছিলো। আমি হয়তো তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো তাই সে অন্য কাউকে বেছে নিয়েছিলো। আমার স্বপ্ন হয়তো তার মতো এত বড় ছিলো না। তার স্বপ্নের কাছে আমার স্বপ্ন বর্ণনা করলে স্বপ্নরাই লজ্জ্বা পাবে। কিন্তু মানুষের ইচ্ছে শক্তি সবসময় যে এক থাকে না সেটার প্রমাণ ও পেয়েছি। প্রমাণটা হচ্ছি আমি। এই যে তাকে অন্যকারো সাথে দেখেও যে বেঁচে আছি এটাই তো অনেক। এর থেকে বড় শক্তি আমি আর ভাবতে চাইনা।

ঠিক সে'দিন বিকেলেই অচেনা নম্বর থেকে আমার মোবাইলে একটা কল আসে। মোবাইলটা এখন সবসময়ই সাইলেন্ট থাকে। শেষ মোবাইলের টোন শুনেছিলাম তার দেওয়ার মেসেজের নোটিফিকেশন। এরপর থেকে যে মোবাইল সাইলেন্ট করেছি আজ অবদি সাইলেন্টই আছে। আমার জীবনই সাইলেন্ট হয়ে রয়েছে। আর সেখানে মোবাইল তো পরের কথা। অচেনা নম্বর গুলোর কল উঠাতে খুব ভয় পেতাম। কারণ এই ভেবেই যে যদি সে মানে আমার পাখিটার কন্ঠ কানে চলে আসে। তার আধো ভংগীময় কথা গুলো আমার মন কেড়ে নিয়েছিলো। আর সম্ভবত আমার মোবাইলে একেবারেই কম কল আসতো অচেনা নম্বর থেকে। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় কল বাজার পর বুঝতে পারি যে ফোনে কল আসছে। কলটা উঠালাম। আমি হ্যালো বলার আগেই উপাশ থেকে কেউ কিছু বলে কলটা কেটে দিলো। হাহা আমার আর চিনবার বাকি রইলো না। সব ভুলে গেলেও তো তার কন্ঠ ভুলতে পারবো না।
" হ্যালো হৃদয়। প্লিজ আগামীকাল সকাল ১০ টায় আমার সাথে দেখা করবে। আমি আগামীকাল বের হয়ে তোমাকে ঠিকানাটা জানিয়ে দিবো। "

কথাটা ঠিক সম্ভবত ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই বলেছে। সে খুব তাড়া-তাড়ি কথা বলতো। প্রথমত একটু বুঝতে কষ্ট হতো। অনেক বার জিজ্ঞাসা করতাম কি বলেছো আবার বলো। কিন্তু এমন একটা সময় চলে এসেছিলো যে ঠোঁট নাড়ালেই বুঝতে পারতাম কি বলবে বা বলতে চাচ্ছে। আমিও আর তাকে কল দিলাম না। কোনো ইচ্ছেই এখন কাজ করে না। কারণ সফলতা না পাওয়ার ভয়ে। না যাওয়ার ইচ্ছেটাই বেশি ছিলো। কিন্তু রাতে মোবাইলের মেসেজ চেক করে তার মেসেজ দেখে যেতে ইচ্ছে করলো। মেসেজটি সিম্পলই ছিলো। " প্লিজ এসো "

পরেরদিন সকালে অফিসে ১ ঘন্টা লেইট করে গেলাম। সে কল করে জানিয়ে দিলো কোথায় যেতে হবে। আমি ঠিক ৯:৫৯ মিনিটে গিয়ে সেখানে পৌঁছাই। যে রেস্টুরেন্ট এ আসতে বলেছে সে রেস্টুরেন্টই এখনো খুলেনি। কি আর করার ১০ মিনিটের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার আরো ১০ মিনিট পর সে আসলো। সাথে একটা পিচ্ছি ছিলো। পিচ্ছির বয়স ৪ বছর হবে। আমি দূর থেকেই পিচ্ছিটাকে খুব মনোযোগ ভাবে দেখছিলাম। কি কিউট পিচ্ছিটা। আমার সামনে আসতে তার কন্ঠ শুনতে পেলাম। "আম্মু সালাম দাও"
- আসসালামু ওয়ালাইকুম আংকেল।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম মামনী। কেমন আছো তুমি?
- ভাল।

একেবারে তার মতোই দেখতে। না তার থেকে হয়তো একটু বেশিই কিউট ছিলো। ঠিক জানি না। এইগুলো নিয়ে একা একাই ভাবছিলাম। আমার সামনে যে তারা দাঁড়িয়ে আছে তা কিছুক্ষণের জন্য ভুলেও গিয়েছিলাম।

- দাঁড়িয়ে আছো যে?
- ১১ টার আগে এই রেস্টুরেন্ট খুলে না।
- ও। তাহলে কি দাঁড়িয়েই থাকবে?
- কি জন্য ডেকেছো বলো। আমার হাতে সময় নেই।
- কেনো? অন্য কারো সাথে দেখা করার কথা?
- দেখো এইসব কথা আমি উঠাতে চাইনা। বাই দ্য ওয়ে কেমন আছো?
- আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভাল আছি। তুমি কেমন আছো?
- অনেক ভাল আছি। অন্তত কারো প্যারা তো সয্য করতে হচ্ছে না।
- আচ্ছা আমরা অন্য কোথাও গিয়ে বসতে পারি? দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
- কোথায় যাবে?
- আচ্ছা ঐ রেস্টুরেন্টটা তো মনে হয় খুলেছে।
- কোনটা? যেটাতে আমরা বসতাম।
- প্লিজ আমি ঐ খানে যাবো না। এইদিকেই অন্য কোথাও বসি।
.
তখন প্রায় সাড়ে ১০ টার মত বেজে যায়। অন্য রেস্টুরেন্ট গুলো খুলেছে। পরে অন্য একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম।

- মামনী কি খাবে তুমি?
- কিছু খাবো না।
- আইস্ক্রিম খাবে?

একবার ওর আম্মুর দিকে তাকালো মেয়েটা। আর আমার বুঝতে বাকি রইলো না যে আইস্ক্রিম পছন্দ করে। ওর আম্মুও অনেক পছন্দ করতো আইস্ক্রিম। পিচ্ছিটা আইস্ক্রিম খাচ্ছিলো কত সুন্দর করে। আমি তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম।

- তো কি করছো আজকাল?
- একটা জব করছি।
- যাক ভাল তো। জব তো করছো।
- মৃদু হেসে বললাম। হ্যাঁ জব করছি।
.
- আচ্ছা কেনো ডেকেছো? আমার হাতে সময় নেই। উঠতে হবে।
- এরকম করছো কেনো? একটু থাকলে কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে তোমার। একদিনই তো সবসময় তো আর প্যারা দিবো না।
- সে অধিকারটা তুমি নিজেই হারিয়েছো। আচ্ছা উঠলাম আমি। ভাল থেকো।
- আচ্ছা তুমিও ভাল থেকো। অবনী আংকেল Bye বলো।
- Bye আংকেল।
- আল্লাহ্‌ হাফেজ মামনী।
.
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার আগে ওয়েটারকে বলে আসি একটা আইস্ক্রিম তাকে দিতে। কারণ তার অনেক পছন্দের ছিলো। হয়তো আট বছরে তার পছন্দের তালিকা থেকে এটা বঞ্চিত হবে না। তবে একটা কথা বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম আসলে ভুলে নাকি ইচ্ছে করেই বলিনি বুঝছি না। কেনো জানি আজ পুরোনো কথাটি উঠাতে ইচ্ছে করেনি। আর তাকে বলতেও পারিনি "কেনো ছেড়ে চলে গিয়েছিলে?" আর তার মেয়ের নাম অবনী রেখেছে। খুব খুশি হইলাম। কারণ আমার কথা যে তার মনে আছে সেটাই তো অনেক। বিয়ের পর সুন্দর একটা সংসার হবে, মেয়ে হলে 'অবনী' নাম রাখবে। বাচ্চা তাকে আম্মু বলে ডাকবে। সবই ঠিক আছে শুধু আমি ছাড়া। ভাল থাকুক সে তার সুন্দর সংসার নিয়ে।

(হৃদয় নাদিম)

Comments