আজ তার বিয়ে



রৌদের তাপে পরান যায় যায় অবস্থা। এত রৌদের মধ্যেই বাসা থেকে বের হওয়াটা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে।তবুও বের হতে হবে কারণ রৌদের ভয়ে বাসায় বসে থাকলে তো পেটে ভাত জুটবে না।সামান্য একটা ছোট খাটো অফিসে চাকরি করি দু'বছর যাবৎ।সেলারি যা পাই তা দিয়ে টেনে টুনে সংসার চলে যায়।
.
কথাটি রোজই শুনতে হয় অনিকের তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা যখন তার মাকে এই কথা গুলো বলে তখন মাঝে মাঝে ভাবে নিজেই কিছু একটা করি। আর কতো করবে তারা আমার জন্য। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এইসব ভেবেই বাসা থেকে বের হয় ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
.
কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য হেটেই যাওয়া শুরু করে। মধ্যবিত্ত ছেলেদের মানিব্যাগ সবসময় ফাঁকা থাকে।কারণ বাসা থেকে হিসাব করেই টাকা দেয়।আর চাইলেও তাদের ইচ্ছে চাহিদা সবসময় মেটাতে পারেনা।কারণ তারা মধ্যবিত্ত। একমাত্র মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েরাই জানে সমাজে চলা কতোটা কষ্ট।
.
রাস্তার বাম পাশ দিয়ে হাটছিলো আর ভাবছিলো এভাবেই কি কাটবে বাকিটা জীবন। তবে কি সুখেরকাঁটা মনের মধ্যে গাঁথতে পারবেনা কখনো?
এরকম কিছু প্রশ্ন বার বার মনের মধ্যেই জিজ্ঞাসা করছে। শুধু একটাই উত্তর বের হচ্ছে আমি "মধ্যবিত্ত"।
.
ক্যাম্পাসের মাঠে যেয়ে বসে ক্লাস শেষ করে। সকালে নাস্তা করা হয়নি তখনো।বেলা ১২ টা ৪৫ মিনিট। হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলো। একটা চাকরি খুবই দরকার। তা নাহলে চলা সম্ভব নয়।কারো ডাকে উপর থেকে সামনের দিকে তাকায় অনিক।
.
- এখানে বসে আছিস কেনো? 
- এমনি মাথাটা ব্যাথা করছিলো একটু।
- ঐ দিকে একটু সড়ে বস।
- হুমম বস।
- আচ্ছা অনিক একটা সত্যি করে কথা বলবি?
- হুমম বলবো।
- তোকে ইদানীং ধরে দেখছি একেবারে মন মরা হয়ে থাকিস।আমাদের সাথেও কথা বলিস না। কারণটা কি আমার সাথে শেয়ার করা যাবে?
- কি বলবো তোকে।শুধু শুধু তোর মন খারাপ হবে শুনে।আমি চাইনা তোর মন খারাপ হউক।
.
কথাটা বলেই অনিক উঠে দাঁড়ায় এবং সামনে হাটা শুরু করলো। কিছুটা পথ যেতে যেতে কয়েক ফোটা অশ্রুজল বের হলো। যা ডান হাতের আঙুল দিয়ে জল মুছে ফেলে।
.
অন্যদিকে দিয়া সেইখানেই বসে আছে। তাঁকিয়ে দেখছে অনিকের পিছু চলা। দিয়া আর অনিকের বন্ধুত্বটা একটা সময় ভালবাসায় পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু কখনো কেউ কাউকে বলেনি। তবে তারা জানে যে তারা এক অপরকে পছন্দ করে। কিন্তু কখনো কেউ প্রকাশ করেনি।
.
ঠিক ৪ মাস পর ফাইনাল ইয়ার। প্রস্তুতি ততোটাও ভাল না যতটা থাকার দরকার ছিলো। আল্লাহ্‌ তা'আলার অসীম রহমতে খুব ভাল মতোই পরিক্ষা শেষ হয়। কিছুদিন ধরে দিয়া এবং অনিকের মধ্যে দেখা হয় না।দিয়া মাঝে মধ্যে ফোন করলেও অনিক ঠিক মতো কথা বলে না।কিই বা বলবে বলার মতো কিছু কি আছে?
এটাই ভেবে আর কিছুই বলা হয় না।
.
দুই মাস পরঃ

- হ্যালো অনিক।
- হ্যাঁ দিয়া বল।কেমন আছিস?
- জানিনা কেমন আছি।আজ বিকেলে একটু দেখা করতে পারবি প্লিজ?
- হুমম পারবো। কোথায় আসতে হবে বল।
- টেক্সট করে জানিয়ে দিচ্ছি।
- আচ্ছা।
.
অনিকেরও ভাল লাগছিলো এই ভেবে যে অনেকদিন পর দিয়ার সাথে দেখা হবে।বলে রাখা ভাল।দিয়া ছিলো ধনীর দুলালী। দিয়ার বাবা-মার একমাত্র মেয়ে ছিলো। যখন যা চাইতো তাই পেতো। দিয়ার সাথে অনিকের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো অনেক বাজে।যার ফলে অনিক সবসময় দিয়ার কথায় প্রশ্রয় দিতো না।
.
বিকেল ৪ টায় রেস্টুরেন্টে গিয়ে পৌঁছাতে হবে।৩:৩০ মিনিটে রওনা দিলো যেতে লাগবে ২০ মিনিট। রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করতেই দিয়াকে দেখতে পেলো। গিয়ে বসলো দিয়ার পাশের চেয়ারে।
.
- কখন আসছিস?
- এইতো ২০ মিনিট হবে।
- তো কি খবর। কেমন আছিস? 
- ভালো না।<কান্না কন্ঠে>
- কেনো? আরে কাঁদছিস কেনো?
- অনিক বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করেছে।
- এটাতো খুশির কথা।তুই কাঁদছিস কেনো? <বুক ফেটে যাচ্ছিলো >
- শোন অনিক।
- হুমম বল। 
- আমাকে নিয়ে পালাবি? প্লিজ অনিক প্লিজ
- মানে কি দিয়া।
- মানে বুঝছিস না? আমি তোকে ভালবাসি অনিক। তুই তো এটা জানিসই।
- দেখ দিয়া। আমার পরিবারের সাথে তোর পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড আকাশ পাতাল তফাৎ। এটা তোর পরিবার কখনই মেনে নেবে না। আর তুই পালিয়ে যাওয়ার কথা বলছিস। তোর মা-বাবা কে কষ্ট দিয়ে তুই সুখে থাকতে পারবি?কখনই না আর তুই এই কাজ করলে তোর মা-বাবা অনেক কষ্ট পাবে। তুই কি তাদের কষ্ট দিতে চাস?
.
কথাটি বলছিলো আর কাঁদছিলো দুজনেই।এই চোখের জলই হচ্ছে তাদের না বলা কথাটির একমাত্র কারণ।
.
- আমি কিছু জানিনা। আমি তোকে ছাড়া কিভাবে থাকবো?
- ভাল থাকিস দিয়া।
.
বলেই উঠে চলে আসলো ঐখান থেকে। দিয়ার চোখের জল অনিক সয্য করতে পারছিলো না।কখনো কখনো ভালবাসার কাছে অর্থটাই এসে হাড়িয়ে ফেলে।ভালবাসা আবেগ দিয়ে হয় না। আবেগের কাছে ভালবাসা মুল্যহীন।
.
আজ তার বিয়ে, বাড়িটা কি সুন্দর করে সাজিয়েছে। বাতি দিয়ে পুরো বাড়িটা জ্বলছে।জ্বলবেই না কেনো মোফাজ্জল সাহেবের একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা।সুখে থাকুক দিয়ার নতুন সংসার।
.
ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। হাতে সিগারেট, সেইদিনই প্রথম হাতে সিগারেট নেয় অনিক। সিগারেটের ধুয়ায় অনিকের জমিয়ে থাকা কষ্ট গুলো বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে। আর ভাবছে এই জীবন রেখে কি লাভ?
যেখানে মনের মানুষটিই পাশে থাকবে না। সুইসাইড করার কথা ভাবছে আর অন্যদিকে তার মা-বাবার কথা মনে আসছে।
.
না মা-বাবার জন্য হলেও তাকে বেঁচে থাকতে হবে। এই একটা কথাই অনিকের মতামত পরিবর্তন করে ফেলে।মাঝে মাঝে নিজের ভালবাসাকেই বুকের মধ্যে কবর দিতে হয়।
.
এখন অনিক নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে।এখন সে নিজেই তার পরিবার চালাচ্ছে।খুবই ভাল আছে অনিক হাজারটা কষ্ট বুকে রেখে।সব কিছুই হয়েছে অনিকের শুধু তার প্রিয়মানুষটি ছাড়া। 
.
.
.

Ridoy Nadim (((AR PagLaaa)))
.
(((সমাপ্ত)))

Comments