ঘুম নিয়ে লঞ্চ থেকে বের হই সবাই। সবাই খুব ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু সব মিলিয়ে ভালই ছিলো লঞ্চ ভ্রমণটা। ঘূর্ণিঝরের ব্যাপারটা ভুলেই যাই। বরিশালের জায়গা গুলো আসলেই অনেক সুন্দর। সব মিলিয়ে ভালই লাগছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে টয়া কল দেয়।
.
- কিরে এসেছিস?
- হ্যা রে। মাত্র নামলাম লঞ্চ থেকে। তুই কোথায়?
- আমি রাস্তায়। ২০ মিনিট লাগবে আসতে। একটু অপেক্ষা কর।
- আচ্ছা ঠিক আছে আয় তাহলে।
- হুমম।
.
২০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। তাই সবাই একসাথে চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেলাম। চা খেলে ঘুম কেটে যায়। তাই ঘুম কাটানোর জন্য চা খেয়ে নিলাম। বাসা থেকে আব্বু কল দিলো।
.
- কিরে বাবা গিয়ে পৌঁছেছিস?
- হ্যা আব্বা। ৫ মিনিট হলো লঞ্চ থেকে নামলাম।
- আচ্ছা সাবধানে থাকিস। আর নে তো মায়ের সাথে কথা বল।
- হুম দাও।
- হ্যালো মা।
- কি করছিস বাবা?
- এই তো মা চা খাচ্ছি সবাই।
- সারারাত তো ঘুমাসনি।
- হুম মা। সবাই আড্ডা দিয়ে সময় পাড় করেছি।
- তোর সাথে কে কে গেছে?
- আমি আর আমার রুম মেট রা।
.
রবিনদের কথা বলিনি। কারণ মা জানে যে রবিন আমার সাথে নেই। শুধু আপু জানতো রবিনদের ব্যাপারটা। তাই মা'য়ের কাছে ওদের কথা লুকালাম।
.
- আচ্ছা ঠিক মতো থাকিস। টয়াদের বাসায় এখন?
- না মা। টয়া আসতেছে আমাদের নেওয়ার জন্য।
- আচ্ছা ওদের বাসায় গিয়ে আমাকে ফোন করে জানাস।
- ঠিক আছে মা। চিন্তা করো না তোমরা।
- আচ্ছা তাহলে রাখি।
- আচ্ছা মা। আল্লাহ্ হাফেজ।
.
মোবাইলে তাকিয়ে দেখলাম ব্যাটারি লো। তাই চার্জে দেওয়ার জন্য পাওয়ার ব্যাংক খুঁজলাম। নীলার কাছে পাওয়ার ব্যাংক ছিলো। ওর মোবাইল চার্জ হচ্ছিলো। পরে আমার মোবাইলে চার্জে দিয়ে দিলো। ওর কাছেই আমার মোবাইল ছিলো। নীলা আমার মোবাইল চেক করছিলো। পরে আমি আর রুবেল একটু সামনে গেলাম।
.
- বন্ধু খালি হাতে গিয়ে যাবো? কিছু নিয়ে গেলে কেমন হয়।
- সেটা তো ভাবিনিরে। কি নিয়ে যাওয়া যায়?
- মিষ্টিই নিয়ে গেলে ভাল হয়।
- এত সকালে কি মিষ্টির দোকান খোলা থাকবে?
- এখন খোলা থাকবে না। তোর ফ্রেন্ডের বাসার যাওয়ার পথে নিয়ে নিবো নে।
- হুম তাহলে ঠিক আছে।
- বন্ধু।
- কি বল।
- ঐ দেখ পোস্টারে কাজী অফিসের নম্বর দেওয়া আছে।
- তো কি করবো এখন?
- কাজে লাগতে পারে। দাড়া নম্বরটি মোবাইলে রেখে দেই।
- যা ইচ্ছে কর।
- বন্ধু আর একটা কথা।
- হুম বল কি।
- আমার ব্যাপারটা একটু দেখিস কিন্তু।
- হাহাহা। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। এখন চল সবার কাছে যাই।
- হুমম চল।
.
সামনে গিয়ে দেখি টয়াও ঐখানে। তার মানে টয়া এসে পড়েছে। আমাকে দেখে টয়া দৌড়ে এসে আমার সাথে হাগ করে। অনেকদিন পর দেখা ওর সাথে।
.
- কখন এসেছিস?
- ৫ মিনিট হলো।
- ওহহহ। আমরা একটু সামনে ঘুরে দেখে আসলাম।
- হুম। আচ্ছা পরিচয় করিয়ে দেই। ও আমার চাচাত বোন দিয়া।
- আচ্ছা রবিনের বউকে দেখেছিস?
- হ্যা দেখেছি। সাথে তোর হবু বউকেও দেখেছি।
- দেখেও ফেলছোত?
- হ্যা। আচ্ছা এখন চল গাড়িতে যাই।
- হুম চল।
.
আমাদের নেওয়ার জন্য টয়া এবং ওর বোন গাড়ি নিয়ে আসে। রুবেল তো টয়ার বোনকে দেখে চিনে ফেলে। পরে জানতে পারি যে রুবেল অনেক আগে থেকেই দিয়াকে পছন্দ করতো। কিন্তু কখনো বলতে পারেনি। সব কিছু যেনো খুব সহজেই হয়ে যাচ্ছে। দিয়াকে দেখতে পেরে রুবেল ও অনেক খুশি হয়। পরে সবাই গিয়ে গাড়িতে উঠি। নীলা জানালার পাশে গিয়ে বসে আমিও তার পাশে গিয়ে বসলাম। টয়া আর নীলার মাঝখানে বসি আমি। আমি আর টয়া সব জমানো কথা বলতে থাকি।
.
অন্যদিকে সবাই গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ে। নীলারও ঘুম পাচ্ছিলো। আমি পরে নীলাকে জিজ্ঞাসা করলাম।
.
- ঘুম পাচ্ছে?
- না। মাথাটা ব্যথা করছে অনেক।
- আচ্ছা ঘুমিয়ে পড়ো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
- না সমস্যা নেই।
.
টয়া নীলার সাথে আমার ব্যাপারে কথা বলছিলো। আমি শুধু শুনছিলাম তাদের দু'জনের কথা। রুবেল সামনে বসেছিলো। ও তো গ্লাস দিয়ে দিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলো। ব্যাপার আমি বুঝতে পেরে। রুবেলকে ইজ্ঞিত করে বলি।
.
- এভাবে তাকিয়ে থাকলে চোখের পাওয়ার কমে যাবে।
.
রুবেল বুঝতে পেরে হেসে দেয়। কিন্তু অন্য কেউ আর বুঝে নাই। গাড়ি চলছিলো একটু পর মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে গাড়িটা থামাতে বলে রুবেল। পরে আমি আর রুবেল গাড়ি থেকে নামি। এবং দোকান থেকে মিষ্টি আর দই নিয়ে নিলাম। টয়া তো বকা-বকি শুরু করে দিছে। কেনো এইগুলো নিলাম। পরে গাড়িতে উঠে আবার যাওয়া শুরু করলাম।
.
গাড়ির মধ্যে পরে নীলাও ঘুমিয়ে যায়। ঘুমের মধ্যে আমার কাধে মাথা রাখে নীলা। টয়া আবার আমাদের ছবি তুলে। বলে যে নীলাকে দেখাবো এইগুলো। ১ ঘন্টার মতো লাগে টয়াদের বাসায় পৌঁছাতে। ওদের বাসার সামনে গিয়ে গাড়ি থেকে নামি। আমাদের দেখতে পেয়ে আংকেল - আন্টি আসেন।
.
- আসসালামু ওয়ালাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো বাবা? আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?
- না আংকেল।
- আচ্ছা তোমরা ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম করো। পরে কথা হবে।
- জ্বি ঠিক আছে আংকেল।
.
পরে বাসায় গেলাম। ফ্রেস হয়ে নিলাম সবাই। একসাথে নাস্তা করলাম। কিন্তু সিগারেটের প্যারায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। নাস্তা শেষ করে নীলা এবং সুমাকে বাসায় রেখে আমরা বাহিরে গেলাম একটু। বাহিরে থেকে সিগারেট খেয়ে এসে পরে আমরা সবাই ঘুম দিলাম। কে কিভাবে ঘুমিয়েছি তার কোন খেয়াল নেই।
.
ঘুম থেকে উঠে সবার সাথে কথা বললাম। আংকেল আন্টির সাথে অনেকক্ষণ কথা বললাম। পরে আব্বু - আম্মুর সাথে ফোনে কথা বলিয়ে দিলাম। টয়াদের বাসাটা অনেক বড় ছিলো। পুরো বাসাটা ঘুরে দেখলাম। এখনো বাসাটা সাজানো হয়নি। তবে বিয়ের গেইট লাগানো ছিলো। যেহেতু আরো অনেকদিন সময় ছিলো। তাই পুরোপুরিভাবে সাজানো হয়নি।
.
পরে রুমে আসি। সবাই উঠে যায় ঘুম থেকে। কিন্তু নীলা তখনও ঘুমোচ্ছিলো। তাই তাকে আর ডাকেনি কেউ। পরে গিয়ে নীলাকে ঘুম থেকে উঠালাম।
.
- মাথা ব্যাথা কমেছে?
- না এখনো একটু একটু আছে।
- আচ্ছা তুমি শুয়ে থাকো। আমি মেডিসিন নিয়ে আসি।
.
পরে টয়ার কাছে থেকে মেডিসিন নিয়ে নীলার কাছে গেলাম। নীলাকে মেডিসিন গুলো খাইয়ে দিলাম। কিন্তু তখন আর সে ঘুমোবে না। উঠে যায়। পরে আমি আর নীলা সবার কাছে যাই। আমাদের দেখে সবাই খুশি হয়।
.
- আচ্ছা সবাই গোসল করে নে। পরে একসাথে খেয়ে বিকেলে বাহিরে যাবো নে।
- হুম ঠিক আছে টয়া।
.
এক জন এক জন করে গোসল করে ফেললাম। দুপুরে খাবার খেলাম সবাই একসাথে। আমার খেতে একটু লেট হতো। আমি তাড়া-তাড়ি খেতে পারতাম না। সবাই আমার খাওয়া দেখে হাসা-হাসি করে। আমি নাকি মুরগির মতো ঠুকরে ঠুকরে খেতাম। সবার খাওয়া শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমার খাওয়া শেষ হয়নি। ওদের জন্য ভাল করে খেতেও পারলাম না।
.
- এভাবে একটু একটু করে খায় কেউ?
- হ্যা আমি এভাবেই খাই। আম্মু খাইয়ে দিলে তাড়া-তাড়ি আমার খাওয়া হয়ে যেতো।
- ইশশশ বুইড়া বেটা আবার আম্মুর হাতে খায়।
- হুহ। বিয়ের পর বউয়ের হাতে খাবো।
- ইশশ শখ কতো।
- কেনো খাইয়ে দিবেনা?
- পরের টা পরে দেখা যাবে।
- আচ্ছা। ঠিক আছে। এখন রেডি হন। সারাদিন কি বাসায় বসে থাকবো? একটু বাহিরে নিয়ে যান না।
- ২ মিনিট অপেক্ষা করো রেডি হয়ে আসতেছি।
.
আমি গোসল করে লুংগি পড়ে ছিলাম। তাই তখনও লুংগি পড়াই ছিলাম। পরে গিয়ে রেডি হয়ে আসলাম।
.
- হুমম চলো। বাকিরা কোথায়?
- তারা অনেক আগেই বাহিরে চলে গেছে। আপনার মত না।
- আমাদের রেখেই চলে গেছে?
- হ্যা।
- তাহলে চলো আমরা কেনো দাঁড়িয়ে আছি। আমরাও বের হই।
- জ্বি চলেন। আপনার জন্যই তো তাদের সাথে যাইনি।
.
পরে আমরাও বের হলাম। বাকি সবাই ঘুরতেছে ছবি তুলতেছিলো। পরে আমরাও গেলাম। সবাই একসাথে গ্রুপ ছবি তুললাম। এবং আমার আর নীলার কয়েকটা ছবি তুলে দেয়। টয়া ছবি দেখিয়ে বলে। দু'জনকে মাশাআল্লাহ্ খুব মানিয়েছে। কথাটি শুনে নীলা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।
.
- ওলে বাবা। ভাবি দেখি লজ্জাও পায়।
- লজ্জা তো পাবেই। তোদের মতো নাকি আমার ব__।
- পুরোটা বললি না কেনো? বুঝেছি তো বউ বলতে চেয়েছিস।
- আচ্ছা এখন চুপ কর টয়া। আচ্ছা তোর হবু জামাইকে তো দেখলাম না। ছবি নাই?
- আমার কাছে নাই। বাসায় ছবি আছে। বাসায় গিয়ে দেখিস।
- আচ্ছা ঠিক আছে। আর একটি কথা।
- কি বল।
- একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছিস টয়া? রবিন আর ওর বউ একসাথে। রিয়াদ ব্যস্ত মোবাইল নিয়ে ওর খালাতো বোনকে নিয়ে। আর রুবেল ব্যস্ত তোর বোনকে নিয়ে।
- হ্যা রে গাড়িতে খেয়াল করেছিলাম। রুবেল দিয়াকে দেখছিলো।
- রুবেল নাকি আগে থেকেই তোর বোনকে চিনতো। পছন্দ ও করতো। কিন্তু কখনো বলতে পারেনি।
- কি বলিস এটা তো জানতাম না।
- এখন কি কিছু করা যায় না?
- আমি কিভাবে বলবো?
- তুই একটু তোর বোনের সাথে কথা বলে দেখিস।
- এটা দেখবো নে। আগে তোর ফ্রেন্ড যতটুকু পারে দিয়া ইমপ্রেস করুক।পরে আমি দেখবো নে।
- হুমম ঠিক আছে জানু।
- শয়তান পোলা বউয়ের সামনে অন্য কাউকে জানু বলিস।
- কি করবো বল। সে তো আর তাকে জানু বলে ডাকার পারমিশন দেয়নি।
- হুহ। বলতে মানাও তো করিনি। <নীলা বলে>
- হুম সেটাই তো হৃদয়। ভাবি তো ঠিকই বলছে। এখন আমার সামনে ভাবিকে জানু বলে ডাক।
- যা। লজ্জা করে।
.
হেসে দেয় ওরা আমার কথা শুনে। এভাবে আরো কিছুক্ষণ কথা বললাম। পরে সবাই মিলে ঝালমুড়ি খেলাম। আমি প্রচুর ঝাল খেতে পারতাম। কিন্তু নীলা ঝাল খেতে পারতো না। তবুও সবার দেখা দেখি নীলাও ঝাল বেশি খায়। এরপরেই নীলার চোখ লাল হয়ে পানি পড়তে শুরু হয়। পানি খেয়ে ঠিক হয় পরে। আমি টিস্যু দিয়ে তার চোখের পানি মুছে দিলাম।
.
(চলবে)
.
.
লেখাঃ হৃদয় নাদিম

Comments
Post a Comment