"ব্যাচেলর" (১৭ তম পর্ব)


- হ্যালো আম্মু।
- কেমন আছিস মা?
- আলহামদুলিল্লাহ্‌ আম্মু। তুমি কেমন আছো?
- হ্যা ভালো আছি। কি করছিস রে মা?
- সবাই বসে আছি।
- ও। হৃদয় কে দে তো মোবাইলটা।
- ঠিক আছে দিচ্ছি।
.
- এই নিন আম্মু আপনার সাথে কথা বলবে।
- আসসালামু ওয়ালাইকুম আন্টি।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো তোমরা?
- জ্বি আন্টি ভালো আছি।
- নীলা কি বেশি জ্বালাচ্ছে নাকি তোমাদের?
- কি যে বলেন আন্টি। জ্বালাবে কেন? ও তো সবার সাথেই কত মজা করছে।
- এই প্রথম আমাদের ছাড়া একা কোথাও গেলো।
- তা নিয়ে ভাববেন না আন্টি। আমরা তো আছি। আমরা কি আপনার কেউ নয়?
- তোমাদের তো আমি আমার নিজের সন্তানের মতই ভাবি। তা না হলে কি তোমাদের সাথে নীলাকে পাঠাতাম।
- চিন্তা করবেন না আন্টি আমরা ভালই আছি।
- আচ্ছা। আর কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে কিন্তু।
- অবশ্যই আন্টি জানাবো আপনাকে।
- আচ্ছা তাহলে রাখি বাবা। ভাল থেকো।
- ঠিক আছে আন্টি। আল্লাহ্‌ হাফেজ।
.
চিন্তা করাটা স্বাভাবিকই। নীলাকে যে আমাদের সাথে বরিশাল আসতে দিয়েছে এটাই তো অনেক। কোনো মা'ই চায়না তার সন্তানকে অন্য কারো সাথে এত দূরে পাঠাতে। আমাদের আসলেই অনেক বিশ্বাস করতো আন্টি। তাই আমাদের সাথে নীলাকে পাঠিয়েছে। কিন্তু আমি কি আন্টির বিশ্বাসটাকে ভেঙে ফেলছি না তো। মনে মধ্যে কথাটি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম। আমার এমন ভাবনা দেখে নীলা জিজ্ঞাসা করে।
.
- কোনো সমস্যা?
- হ্যা। না কোনো সমস্যা না।
- আম্মু কি বললো?
- আন্টি বললো। সাবধানে থাকতে।
- ওহহহ আচ্ছা।
- আচ্ছা তোমার আম্মু কিন্তু আমাদের অনেক বিশ্বাস করে। কিন্তু আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে তার বিশ্বাসটাকে ভেঙে ফেলতেছি। আচ্ছা আমাদের কি এই জিনিষটা ঠিক হচ্ছে?
- সবই ঠিক হচ্ছে এবং সবই ঠিক। এত কিছু আপনার ভাবা দরকার নেই।
- আচ্ছা তাহলে চলো রাতের খাবারটা করে ফেলি।
- হুমম।
.
সবাইকে নিয়ে একসাথে বসে ডিনার করতে গেলাম। কিন্তু খাবার আমার গলা দিয়ে নামছে না। ঐ চিন্তাই মাথায় আসছে। আন্টিকে ঠকানোটা আমার মোটেও ঠিক হচ্ছে না। আর অন্যদিকে আমিও নীলাকে অনেক ভালবাসি। আরো অনেক কিছু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আমি খাবার টেবিল থেকে উঠে আসি। আমাদের জন্য একটা গেস্ট রুম দিয়ে ছিলেন। ঐ রুমের বারন্দায় গিয়ে সিগারেট ধরালাম। সিগারেট ফুঁকছিলাম চিন্তাটা দূর করার জন্য। কিন্তু না মাথার মধ্যে আরো বেশি চলে আসছিলো কথা গুলো।
.
- বন্ধু কোনো সমস্যা? অসুস্থ লাগছে তোকে।
- না বন্ধু। আমি একটা প্যারার মধ্যে পরে আছি রে।
- কি হয়েছে বল আমাকে।
- আচ্ছা আন্টি তো আমাদের অনেক বিশ্বাস করেন?
- কোন আন্টির কথা বলছিস?
- নীলার আম্মুর কথা বলছি।
- ও। হ্যা বিশ্বাস করেনই তো। না করলে কি আর তার মেয়েকে আমাদের সাথে বেড়াতে পাঠাতো। কিন্তু হঠাৎ এ কথা কেনো? কি হয়েছে বন্ধু?
- নীলার সাথে রিলেশনটা কি ঠিক হচ্ছে?
- ঠিক হবে না কেনো? আর তুই তো তার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাসনি।
- তারপরও।
- বাদ দে তো বন্ধু। তুই নীলাকে ভালবাসিস নীলাও তোকে ভালবাসে। আর দেখবি নীলার ফ্যামিলি তোদের রিলেশন ঠিকই মেনে নেবে। এইসব চিন্তা ভাবনা এখন মাথা থেকে ফেলে দে। প্যাকেটটা দে এখন।
.
রুবেল ও সিগারেট ধরালো। রবিন ও ওর বউ এক রুমে ঘুমালো। নীলা, টয়ার সাথে ঘুমিয়েছে। আর আমরা তিন বন্ধু এক রুমে ঘুমালাম। বারান্দায় অর্ধেক রাত পর্যন্ত কাটিয়ে দিলাম। ঘুম আসছিলো না। রিয়াদ মোবাইলে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে যায়। আমি আর রুবেল বারান্দায় বসে আছি। মোবাইলে গান বাজছিল। আর আমরা সিগারেট ফুঁকছিলাম আর কথা বলছিলাম। হঠাৎ করেই আমার মোবাইলে কল আসে। আর মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলাম নীলার ফোন।
.
- হ্যালো।
- হ্যা নীলা। ঘুমাওনি এখনো?
- হ্যা ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম ভেঙে গেছে হঠাৎ করে। <রাত তখন সাড়ে চারটার মতো বাজে। >
- ঘুমিয়ে পরো। গতকাল তো ঘুমাওনি।
- না এখন ঘুম আসবে না আর। আপনি ঘুমাননি?
- আমার ঘুম আসছে না। তাই আমি আর রুবেল বসে বসে গান শুনছি।
- নিজেও ঘুমাননি আবার রুবেল ভাইয়াকেও ঘুমাতে দেননি।
- ঠিক তা নয়। রুবেলের ও ঘুম আসছিলো না।
- কেনো দিয়ার জন্য?
- হাহাহা। হয়তো বা।
- আচ্ছা রুমের বাহিরে আসুন। একটু দেখবো আপনাকে।
- এখন?
- কেনো কি হয়েছে? সমস্যা আছে কোনো?
- না সমস্যা নেই। আচ্ছা আসছি।
.
টু কোয়াটার প্যান্ট পড়ে ছিলাম। তাই প্যান্টের উপর লুংগিটা পড়ে রুম থেকে বাহির হলাম। আমরা দু'তলায় ছিলাম। দরজা খুলে বের হয়ে দেখি নীলা দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলছিলো। তার পাশে গেলাম। চুপ চাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম সামনে তাকিয়ে কিছুক্ষণ। একটু পর রুবেল দুষ্টামি করে পিছন থেকে এসে ভয় দেখায়। নীলা ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমিও কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম।
.
শেষে বুঝতে পেরে নীলা সরে যায়। নীলা পরে লজ্জা পায়। আমি রুবেলকে বকা দিলাম। কারণ এত রাতে অন্ধকারে এভাবে পিছন থেকে ভয় দেখালে সবাই ভয় পাবে। ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নীলা সেইদিন বুঝে ফেলে যে আমরা স্মোকিং করেছি। নীলা এ নিয়ে রাগা-রাগি করে আমার সাথে কেনো স্মোকিং করেছি।
.
- আচ্ছা সব ঠিক আছে। কিন্তু তুমি বুঝলে কিভাবে যে আমি স্মোকিং করেছি। আমি তো অনেক আগে থেকেই করি। কিন্তু আজ কিভাবে বুঝলে?
- বুকে যখন গেছিলাম তখনই গন্ধটা নাকে এসে লাগছিলো। ছিহ কি বিশ্রী গন্ধ।
- ওহ আচ্ছা।
- আচ্ছা কি? এইগুলো যেনো আর করতে না দেখি।
.
আমাদের কথা শুনে রুবেল যে কোন সময় চলে গেছে দেখিও নাই। পরে নীলাকে তার রুমে দিয়ে আমি আমাদের রুমে চলে আসি। তখন ৫ টা বাজে। আমি রুমে গিয়ে দেখি রুবেল নাক ডাকছে। ও সবসময়ই নাক ডাকে ঘুমানোর সময়। কি আর করার আমার মাথার উপরে বালিশ দিয়ে কিছু আওয়াজ বন্ধু করার জন্য চেষ্টা করলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম নিজেও বুঝতে পারলাম না। সেইদিন স্বপ্নেও নীলাকে দেখলাম। স্বপ্নটা খুবই ভালো ছিলো।
.
সকালে ১০ টার সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে দিলো টয়া। আসলে এটাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দেয়া বলে না। মারা-মারি বলে। ঘুমিয়ে ছিলাম হঠাত করে আমার উপরে কেউ লাফ দিয়ে বসে। সাথে আরোও অনেকের ভর সয্য করতে হলো। তার মানে আমার উপরে আজ সবাই উঠে লাফিয়েছিলো। সকালটাই শুরু হলো দুষ্টামি দিয়ে।
.
- ঐ হাতি গুলা আমি শরীরে এমনেই নাই কিছু। তার মাঝে আবার তোরা উঠেছিস।
- ঠিক করেছি। এখন যা তোর বউকে উঠিয়ে নিয়ে আয়।
- নীলা ঘুম থেকে উঠে নাই?
- কে জানে দুইজন রাতের বেলায় কি করেছিস। যে ঘুম থেকে উঠতে দেড়ি হলো।
- ধ্যাত ফালতু বকিস না তো।
- এখন উঠ। আম্মু নাস্তা বানিয়ে টেবিলে রেখে দিছে। তোদের দুইজনের জন্য আমরা কেউই নাস্তা করতে পারছি না। আচ্ছা রুবেল কোথায় রে ওকে তো দেখতে পাচ্ছি না।
- গিয়ে দেখ বারান্দায় শুয়ে আছে।
.
রাতে এত জোড়ে জোড়ে নাক ডাকছিলো যে ঘুমাতেই পারিনি। পরে রুবেলকে বারান্দায় রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আর রুবেল ঘুমের মধ্যে রুবেলের প্যান্ট ও যদি কেউ খুলে ফেলে এটাও টের পাবে না। পরে গেলাম রুবেলের কাছে।
.
- রুবেল। ওই রুবেল।
- হুমম।
- উঠোছ না কেন?
- একটু পরে উঠি।
- আরে দিয়া তোকে ডাকতেছে উঠ।
- হ্যা। আসলেই বন্ধু দিয়া কোথায়?
.
ঘুম থেকে উঠে বসে দেখে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি। দিয়াও দাঁড়িয়ে ছিলো আমাদের সাথে। পরে রুবেল বুঝতে পারে যে ও বারান্দায় ঘুমিয়ে ছিলো।
.
- কিরে আমি এখানে কেনো হৃদয়?
- আমি কেমনে কমু। তুই তো জানোছ।।
- রিয়াদের কাজ এটা তাইনা?
- আরে না। রিয়াদ করে নাই। হৃদয় তোমাকে এখানে রেখে গেছে যখন তুমি ঘুমিয়ে গেছিলে। <টয়া বলে>
- বন্ধু তুই আমার বন্ধু হইয়া এই কাজ কেমনে করলি?
- আরে বেটা এখন উঠ। পরে এইসব কথা বলা যাবে।
- নারে বন্ধু তুই এইটা কি করলি। দেখতো মশা কামড়াইয়া কি করছে আমারে।
- আসলেই তো। এখন কি তুই উঠবি। দিয়া কিন্তু তোর জন্য নাস্তা না খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। <কানের কাছে গিয়ে আসতে আসতে কথাটি বলি>
- কি বলিস আসলেই?
- আরে বন্ধু হ্যা।
.
তাড়া-তাড়ি উঠে ফ্রেশ হতে যায়। পরে নীলাকে ডেকে দিলাম। সবাই ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেতে বসলাম। নাস্তা করে আংকেলের সাথে বাহিরে গেলাম। সাথে রুবেলকেও নিয়ে গেলাম। লাইটিং এর জন্য কথা বলে। কিভাবে কি করতে হবে পরে লোকদেরকে দেখিয়ে দিলাম। তারা বলেছে আগামীকাল থেকে লাইটিং এর কাজ শুরু করবে। আংকেল আমাদের নিয়ে চায়ের দোকানে গেলেন। পরে একসাথে চা খেলাম। আমাদের নিয়ে পরে বাজারে গেলেন। একসাথে বাজার করলাম। বাজার নিয়ে বাসায় এসে পরলাম রিক্সায় করে।
.
রোদে ঘেমে যাই পুরাই। অনেক গরম ছিলো। বাজারের ব্যাগ গুলো আন্টির কাছে রেখে আমি আর রুবেল রুমে চলে আসি। ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। বিছানার উপর শুয়ে পড়লাম। মোবাইল টিপছিলাম শুয়ে শুয়ে। বাকি সবাই কোথায় খুজছিলাম তাদের। আন্টিকে জিজ্ঞাসা করলাম। আন্টি বললো সবাই নাকি বাহিরে গেছে হাটতে। পরে রুবেলকে টেনে নিয়া গেলাম। নীলাকে কল করলাম।
.
- কোথায় তোমরা?
- বাসার পিছনের দিকে। খুব সুন্দর একটা জায়গায় আছি আমরা।
- বাহ বাহ। সবাইকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলে।
- ইশ। নিজেই তো বাসায় ছিলেন না তাই এসেছি। চলে আসবো?
- না। আমরাই আসতেছি।
- আসেন তাহলে।
.
গিয়ে দেখি আম গাছ থেকে আম পেড়ে খাচ্ছিলো ওরা। আমি তো ভুলেও গাছে উঠতে পারতাম না। কিন্তু রুবেল গাছে উঠতে পারতো। পরে রুবেল গাছে থেকে আমার আর ওর জন্য আম পেড়ে নিয়ে আসে। আম গাছটা অনেক বড় ছিলো। রবিন আর রিয়াদ ঢিল ছুড়ে ছুড়ে পেরেছিলো। কিন্তু যখন দেখলো যে রুবেল গাছে উঠে আম পেড়ে নিয়ে এলো। তখন তারা বলতেছে রুবেলকে নিয়ে এলেই তো ভালো হতো।
.
কাঁচা আম খাচ্ছিলাম সবাই। পরে সবাই বলে আজ পুকুরে গোসল করবে। টয়াদের বাসার ভেতরেই বড় একটা পুকুর আছে। পানি গুলো পরিষ্কারই ছিলো। কিন্তু সাঁতার ও শুধু রুবেল জানতো। কি আর করার রুবেলের ভরসায় পুকুরে গোসল করার সাহস করলাম।
.
(চলবে)
.
.
লেখাঃ হৃদয় নাদিম

Comments